জাতীয় নির্বাচনের আগে জানুয়ারি মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা আগের মাসের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। কারা হেফাজতে মৃত্যু, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার সংখ্যাও বেড়েছে।

একইসঙ্গে বেড়েছে নির্বাচনী সহিংসতা ও রাজনৈতিক মামলায় অজ্ঞাত আসামির সংখ্যাও। গতকাল শনিবার মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রকাশ করা জানুয়ারি মাসের প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

এমএসএফের মাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মাসে মব বা গণপিটুনিতে যেখানে ১০ জন নিহত হন, সেখানে জানুয়ারি মাসে মোট ২১ জন নিহত হয়েছেন।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানুয়ারি মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে 'ভয়াবহভাবে সহিংস ও জটিল' বলে উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং নিজেদের অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করে এমএসএফ।

সুলতানা কামালের নেতৃত্বাধীন মানবাধিকার সংগঠনটি গণপিটুনির ঘটনা 'উদ্বেগজনক হারে' বৃদ্ধির বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলেছে, 'এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব অপরাধীদের আরও সাহসী করেছে, ফলে হতাহতের সংখ্যাও বেড়েছে। এসব ঘটনা আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার স্পষ্ট প্রমাণ।'

প্রতিবেদনে অজ্ঞাত পরিচয় মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে বলা হয়, ডিসেম্বর মাসে অজ্ঞাত পরিচয় মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা ছিল ৪৮। জানুয়ারি মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে ৫৭-তে পৌঁছেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে কারাগারে হেফাজতে ৯ জন মারা যান। জানুয়ারিতে তা বেড়ে ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া জানুয়ারিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা এখনও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এমএসএফ জানায়, কারাগারে মৃত্যুর পেছনে দায়ী বন্দিদের চিকিৎসায় অবহেলা, অমানবিক আচরণ এবং কারা প্রশাসনের ব্যর্থতা।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতা বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে এমএসএফ জানায়, ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনী সহিংসতায় এক জন নিহত হলেও জানুয়ারি মাসে চারজন নিহত ও ৫০৯ জন আহত হয়েছেন।

পুলিশের মামলায় 'অজ্ঞাত আসামি' করার প্রবণতা বৃদ্ধির কথাও তুলে ধরেছে এমএসএফ। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক মামলায় অজ্ঞাত আসামি ডিসেম্বরে ছিল ১১০ জন। জানুয়ারিতে তা বেড়ে ৩২০ জনে দাঁড়িয়েছে।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই কৌশলের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিচারে গ্রেপ্তার সুযোগ পাচ্ছে এবং সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে।

ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারি মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, জানুয়ারি মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির ও প্রতিমা চুরি বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল ২১টি, আগের মাস ডিসেম্বরে ছিল ছয়টি।

প্রতিবেদনে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, জানুয়ারিতে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ২৫৭টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ ৩৪টি, গণধর্ষণ ১১টি।

এমএসএফ প্রতিটি ঘটনার তাৎক্ষণিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। একইসঙ্গে তারা ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।