বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১ দলের নেতারা জানিয়েছেন, কয়েক মাসের আলোচনার পর অধিকাংশ মতপার্থক্য দূর হওয়ায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন বন্টন নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন তারা।

প্রায় তিন মাস ধরে চলা আলোচনার পর দলগুলোর নেতারা বলছেন, ৩০০ আসনে সমঝোতায় পৌঁছানোর ব্যাপারে তারা এখন আশাবাদী।

এ সময় দলগুলো দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনায় বসেছেন। শিগগিরই ১১ দল মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈঠক হওয়ারও কথা রয়েছে।

১১ দলের নেতাদের দাবি, ২০ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগেই আসন বন্টনে চূড়ান্ত সমঝোতা হতে পারে।

কবে নাগাদ তা হতে পারে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শনিবার বলেন, 'এক-দুই দিনের মধ্যেই আমরা ঘোষণা দেবো।' রাজধানীর একটি হোটেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি) ও এনসিপি ছাড়াও এ জোটে আছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)।

শুরুতে সমমনা ৮ দল নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও পরে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি এতে যোগ দেয়।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা মোটামুটি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। সবাই মিলেই চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে।'

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আশরাফুল আলম জানান, নির্দিষ্ট আসনে প্রার্থী চূড়ান্তের পর অন্যদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালউদ্দিন আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রথমে জামায়াত ও পরে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আলোচনায় বসে আমরা বিষয়গুলো মীমাংসা করবো। তারপর এনসিপির সঙ্গে বসতে হতে পারে। এভাবেই আলোচনা এগোচ্ছে।'

তিনি আরও বলেন, 'কিছু আসনে জামায়াত ছাড় দিলেও ইসলামী আন্দোলন ছাড় দেয়নি। আবার কোথাও ইসলামী আন্দোলন রাজি হলেও এনসিপি রাজি হয়নি। এক-দুটি আসনের জন্য কখনো কখনো তিন-চারটি বৈঠক করতে হয়েছে। এ কারণেই সময় লাগছে।'

গত বৃহস্পতিবারও তার দল জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করেছে বলে জানান মাওলানা জালালউদ্দিন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসলামী আন্দোলন ১০০টির বেশি আসন দাবি করায় আলোচনার শুরুতেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পাশাপাশি অন্যান্য দলগুলোও বেশি আসনের দাবি তোলে। গত ২৮ ডিসেম্বর মনোনয়ন জমার শেষ দিনের ঠিক একদিন আগে এনসিপিসহ তিন দল যোগ দিলে অবস্থা আরও জটিল রূপ নেয়।

তার পরপরই নতুন দলের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে 'সন্দেহ ও অবিশ্বাস' প্রকাশ করেন চরমোনাই পীর সৈয়দ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এবং মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতারা। তাদের অভিযোগ, জামায়াত একতরফাভাবে নতুন দলগুলোকে যুক্ত করেছে।

চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিনে জামায়াত ২৭৬টি আসনে প্রার্থী দেয়। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি, এনসিপি ৪৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি এবং খেলাফত মজলিস ৬৮টি আসনে প্রার্থী দেয়।

এতে সবচেয়ে বেশি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তত ২৪০টি আসনে দুই দলের প্রার্থীরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এসব আসনের মধ্যে দুই দলেরই একাধিক শীর্ষ নেতাও রয়েছেন।

আলোচনায় যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী আন্দোলন কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে। গত কয়েক দিনে দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় ৪০টি আসন নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। অবশ্য ইসলামী আন্দোলন এখনও আরও বেশি আসনে প্রার্থী দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। জনপ্রিয়তা ও প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনায় আরেক দফা মূল্যায়নের পর জামায়াত আরও কিছু আসনে ছাড় দিতে পারে।

জামায়াতের সূত্র অনুযায়ী, এনসিপিকে প্রায় ৩০টি আসন দেওয়া হতে পারে। এলডিপি ও খেলাফত মজলিস পেতে পারে ৭টি করে আসন। এবি পার্টি ইতোমধ্যে ২টি আসন পেয়েছে, যা বেড়ে ৩টি হতে পারে। বিডিপি পেতে পারে ২টি আসন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেতে পারে সর্বোচ্চ ১৫টি আসন।

জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধানও সমঝোতার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দলও অন্তত ২টি আসনে লড়তে পারে।