নামকরণ-নাম পরিবর্তনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বন্ধের দাবি শিক্ষক নেটওয়ার্কের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে থাকা হলের নাম পরিবর্তনের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।আজ শনিবার এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়।শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়, দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়। এর মধ্যে অন্যতম নিন্দনীয় হলো—বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ ও নাম বদলের সংস্কৃতি। বহু বছর ধরে এই সংস্কৃতি চলে এলেও এই সংস্কৃতিকে একটা ''শিল্পে'' রূপ দিয়েছিল গত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ সরকার। এতে আরও বলা...
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে থাকা হলের নাম পরিবর্তনের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
আজ শনিবার এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়, দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়। এর মধ্যে অন্যতম নিন্দনীয় হলো—বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ ও নাম বদলের সংস্কৃতি। বহু বছর ধরে এই সংস্কৃতি চলে এলেও এই সংস্কৃতিকে একটা ''শিল্পে'' রূপ দিয়েছিল গত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ সরকার।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজে বহু মানুষের অবদান থাকলেও শুধু শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থে স্থাপনা নির্মাণ একটা প্রতিকারহীন প্রবণতায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। এটা ছিল স্পষ্টত দলের চেয়ে পরিবারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া। এই প্রবণতায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ও এ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনার হিসাব করলেও দেখা যাবে, শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবন, হল, অনুষদ ভবন, বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সড়ক ও চত্বরের নাম পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নামকরণ ও নাম পরিবর্তনের কোনো নীতিমালা না থাকায় এ ধরনের অদ্ভুত কর্মকাণ্ড বছরের পর বছর ঘটেই যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করে, রাষ্ট্র ও জনগণের টাকা খরচ করে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নামকরণের সংস্কৃতি স্পষ্টতই বন্ধ হওয়া উচিত। একইসঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কারও নামে স্থাপিত স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতিতেও রেশ টানা প্রয়োজন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নয়া বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষায় জন্ম নেওয়া জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে। এমন অনেক স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে বা করতে উদ্যত হয়েছে, যা অপ্রয়োজনীয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি খড়্গ পড়েছে শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাগুলোর ওপর। কিন্তু পাশাপাশি দেখা গেছে, যা কিছু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে স্থাপিত, সেগুলোতেও হাত দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর আগের নাম বাতিল করে কোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন না করেই অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা ঘটনার নাম জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করে, এগুলো কোনো চেতনা থেকে নয়, বরং যা কিছু বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, সেগুলোকে মুছে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীলনকশা চলমান রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে।
এতে আরও বলা হয়, এই প্রবণতারই সর্বশেষ নজির গড়া হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কারিগর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। আমরা এই পরিবর্তনের প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করছি এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার দাবি জানাই।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতি বলা হয়, আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নতুন দুই ছাত্রাবাস নির্মিত হয়, তখন জাতীয় দুই নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের নামে এগুলোর নামকরণ করা হয়। ছাত্রাবাস দুটি পাশাপাশি অবস্থিত। এরপর বহু সরকার এসেছে ও গিয়েছে, কখনোই এই দুই ছাত্রাবাসের নাম পরিবর্তনের কথা ওঠেনি।
'চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক ডামাডোলে অনেক ভাঙচুর ও পরিবর্তন হচ্ছে, যার অনেক কিছুই ন্যায্য নয়। জাতীয় নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের নামে বাংলাদেশের প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি পাশাপাশি ছাত্রাবাস থাকার যে সহাবস্থানগত সৌন্দর্য, তা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিকে স্পন্দিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে বলে শেখ মুজিবুরের নাম মুছে ফেলতে হবে। বরং তার নামে একটি ছাত্রাবাস থাকা কেবল ন্যায্যই নয়, প্রয়োজনীয়ও বটে।
উল্টো ওই ছাত্রাবাসের নাম পরিবর্তন করে শহীদ ওসমান হাদির নামে বদলানো একটি হটকারী সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ব উদ্দেশ্যের বহিঃপ্রকাশ।'
শিক্ষক নেটওয়ার্ক আরও জানায়, হাদির হত্যার বিচার ও প্রতিবাদে তারা বরাবরই সোচ্চার। তবে জনআবেগকে পুঁজি করে একটি দীর্ঘদিনের পরিচিত জাতীয় নেতার নামে থাকা ছাত্রাবাসের নাম পরিবর্তন করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হাদির নামে নতুন কোনো ভবনের নামকরণ করা যেতে পারে, কিন্তু বিদ্যমান হলের নাম পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়।
অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।