বরই কিনতে গিয়ে উদ্যোক্তা: এক নারীর জীবন বদলের গল্প
পটুয়াখালীর মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের গুয়াবাড়িয়া গ্রামের নাম অনেকের কাছেই অপরিচিত। কিন্তু এই গ্রামেই গড়ে উঠেছে এক নীরব সাফল্যের গল্প। গল্পের প্রধান চরিত্র তাসলিমা বেগম—যিনি তিন বছর আগেও ছিলেন গৃহিনী, আর এখন সফল উদ্যোক্তা ও বরই চাষি।এই পথচলার শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। কোনো প্রশিক্ষণ, সরকারি প্রকল্প বা বড় মূলধন ছাড়াই অন্যের বাগান দেখে জন্ম নেয় একটি স্বপ্ন।তিন বছর আগে পাশের পেয়ারপুর গ্রামে বরই কিনতে গিয়ে একটি বাগান তার চোখে পড়ে। সারি সারি গাছ, থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা ফল আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করে। সেদ...
পটুয়াখালীর মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের গুয়াবাড়িয়া গ্রামের নাম অনেকের কাছেই অপরিচিত। কিন্তু এই গ্রামেই গড়ে উঠেছে এক নীরব সাফল্যের গল্প।
গল্পের প্রধান চরিত্র তাসলিমা বেগম—যিনি তিন বছর আগেও ছিলেন গৃহিনী, আর এখন সফল উদ্যোক্তা ও বরই চাষি।
এই পথচলার শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। কোনো প্রশিক্ষণ, সরকারি প্রকল্প বা বড় মূলধন ছাড়াই অন্যের বাগান দেখে জন্ম নেয় একটি স্বপ্ন।
তিন বছর আগে পাশের পেয়ারপুর গ্রামে বরই কিনতে গিয়ে একটি বাগান তার চোখে পড়ে। সারি সারি গাছ, থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা ফল আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করে। সেদিন বরই কেনার চেয়ে বাগান দেখেই বেশি আকৃষ্ট হন তাসলিমা। বাড়ি ফিরেই বিষয়টি তিনি স্বামীকে জানান।
কয়েক দিন পর বাড়ির পাশের নদীর পাড়ে ২০ শতাংশ পতিত জমিতে বরই বাগান করার সিদ্ধান্ত নেন তারা। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। পরিবার ও প্রতিবেশীদের অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন।
কেউ কেউ বলেন, এখানে কিছু হবে না। নারী হয়ে এত ঝুঁকি নিলে লোকসান হবে। কিন্তু দমে যাননি তাসলিমা বেগম।
যশোর থেকে থাই আপেল কুল, কাশ্মীরি আপেল কুল ও বলসুন্দরী জাতের প্রায় ২০০টি কলম সংগ্রহ করেন তিনি। নিজের জমানো টাকা ও স্বামীর সহায়তায় শুরু হয় বাগান তৈরির কাজ। জমি পরিষ্কার থেকে শুরু করে গর্ত তৈরি, চারা রোপণ—সবকিছুতেই সরাসরি যুক্ত ছিলেন তাসলিমা।
তাসলিমা বেগম বলেন, 'প্রথম বছর মনে হয়েছে হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু গাছগুলো বড় হতে শুরু করলে সাহস ফিরে পাই।'
সেচ, সার, রোগবালাই—সবকিছুই শিখতে হয়েছে অভিজ্ঞতা থেকে। কখনো পাতায় রোগ, কখনো পোকার আক্রমণ, কখনো ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কাও ভুগিয়েছে বলে জানান তিনি।
এরপর এক বছরের মধ্যেই গাছে ফল আসে। আয় বেশি না হলেও সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় অর্জন। তিনি বুঝতে পারেন, স্বপ্নটা বাস্তব হতে পারে।
দ্বিতীয় বছরে ফলন বাড়ে। বাজারে চাহিদা ভালো থাকায় দামও পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সে বছর প্রায় এক লাখ টাকা লাভ হয়।
চলতি তৃতীয় মৌসুমেও তাসলিমার খরচ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। সব ফল বিক্রি হলে দেড় লাখ টাকার মতো লাভ হবে বলে আশা করছেন।
বর্তমানে প্রতি কেজি বরই বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকা দরে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ২০–২৫ কেজি ফল মিলছে।
বাগানে গেলে দেখা যায়, মাঝারি আকৃতির গাছের ডালে ডালে ঝুলছে সবুজ ও হলদে বরই। রাস্তার পাশে হওয়ায় প্রতিদিন পথচারীরা থেমে দাঁড়ান। কেউ ছবি তোলেন, কেউ সরাসরি ফল কিনে নেন।
তাসলিমা বেগমের স্বামী ঢাকায় চাকরি করেন, ছেলে সৌদি আরব প্রবাসী। আগে তিনিও ঢাকায় থাকতেন। বাগান শুরু করার পর গ্রামেই স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, 'গ্রামে থেকেও যে সম্মানের সঙ্গে আয় করা যায়, সেটা আমি প্রমাণ করতে চেয়েছি।'
তার সাফল্য এখন আশপাশের নারীদের অনুপ্রেরণা। অনেকেই তার কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন, কেউ কেউ ইতোমধ্যে বরই চাষ শুরু করেছেন।
ভবিষ্যতে নারীদের নিয়ে একটি সমবায় গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তাসলিমা বেগম, যাতে আরও বড় পরিসরে ফল চাষ করা যায়।
পটুয়াখালী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম মজুমদার দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ধান ও মুগ ডালের পাশাপাশি বরইসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফলের চাষ এলাকায় দ্রুত বাড়ছে।
তিনি বলেন, 'গত অর্থবছরে সদর উপজেলায় বরই চাষ হয়েছিল ৩৬ হেক্টর জমিতে। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হেক্টরে। উন্নত জাত ও আধুনিক চাষপদ্ধতির কারণে উৎপাদনও বেড়েছে।'