সরকারকে একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সত্য কথা বলে, আমলাতন্ত্র বা গোয়েন্দা সংস্থা নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম।

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের (কেআইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত 'গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬'-এ তিনি এ কথা বলেন।

মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে এই সম্মিলনের আয়োজন করেছে।

বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান মাহফুজ আনাম।

সরকারের উদ্দেশে মাহফুজ আনাম বলেন, সরকার, আপনি মনে রাখবেন, আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোকরা বলবে না ভয়ে, আপনার সরকারের ব্যুরোক্রেসি (আমলাতন্ত্র) বা ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি (গোয়েন্দা সংস্থা) বলবে না। তারা সব সময় আপনাকে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা আপনাকে সত্য কথা বলবে।

একটি সরকার যদি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে এবং উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে, তবে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে মনে করেন মাহফুজ আনাম।

তিনি বলেন, সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলো কতটা সঠিক, জনগণ তা গ্রহণ করছে কি না বা সেখানে দুর্নীতি হচ্ছে কি না—এসব তথ্য কেবল স্বাধীন সাংবাদিকতাই তুলে ধরতে পারে।

তিনি সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি যে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট নিয়ন্ত্রণ করেন, এক মুহূর্তের জন্যও মনে করবেন না এই টাকা আপনার। এই টাকা ট্যাক্সপেয়ারদের, জনগণের। আপনি কীভাবে সেটা ব্যবহার করছেন, তা দেখার অধিকার জনগণের আছে। আমরা গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব প্রকল্পকে সমর্থন করব, কিন্তু দুর্নীতি হলে সেটা বলার দায়িত্ব স্বাধীন সাংবাদিকতার।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে মাহফুজ আনাম বলেন, চাকরি অবশ্যই, কিন্তু তার ঊর্ধ্বে একটা চিন্তা আছে—সমাজসেবা। সমাজসেবার মধ্যে আছে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, বৈষম্য দূর করা এবং সব ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা। এটাই আমাদের পেশার মূলমন্ত্র।

সংবিধানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংবিধানে স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কারণ, যে সমাজে সাংবাদিকতা শক্তিশালী ও স্বাধীন, সেই সমাজ তত বেশি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন হয়।

তিনি সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সততা, নিষ্ঠা এবং নৈতিক মূল্যবোধ ধরে রাখার আহ্বান জানান।

সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান ও সম্পাদকদের প্রসঙ্গে মাহফুজ আনাম বলেন, সম্পাদক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকটি আচরণ ও কাজ আমাদের পেশা ও প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করে। আমি যদি সম্পাদক হিসেবে নৈতিকতার বিচ্যুতি ঘটাই, তবে আমার প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পেশা কলুষিত হয়।

গণমাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অন্য শিল্পে যে মানসিকতা নিয়ে আপনারা বিনিয়োগ করেন, সেই একই মানসিকতা নিয়ে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করলে জনগণের আস্থা অর্জন করা যাবে না।

সাংবাদিকদের 'সামাজিক ডাক্তার' হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, চিকিৎসকের কাছে মানুষ যেমন অসুখের কথা জানতে যায়, তেমনি সাংবাদিকরা সমাজের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরেন। ব্যবসায়িক স্বার্থে সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করলে জনগণ তা জনগণ গ্রহণ করবে না বলে মালিকদের সতর্ক করেন তিনি।

বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা একে অপরের পরিপূরক।

তিনি আদালত অবমাননা বা কন্টেম্পট অব কোর্ট আইনের অপব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমরা বিচার বিভাগকে হেয় করার জন্য লিখি না, তাদেরও জবাবদিহির মধ্যে রাখতে চাই। বিচার বিভাগ যেন স্বাধীন সাংবাদিকতার সহায়ক শক্তি হয়।

জুলাই বিপ্লবের ফলে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, একইভাবে সাংবাদিকতারও একটা নতুন গণতান্ত্রিক, বলিষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ এথিক্যাল জার্নালিজম বা নৈতিক সাংবাদিকতা করার সময় এসেছে। আসুন, আমরা সবাই মিলে এই পেশাকে আরও বেশি জনগণের কাছে নিয়ে যাই।